১৬ বছর পর আবার বিশ্বকাপ জিতল স্পেন। রবিবার নিউ জার্সিতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দাপটের সঙ্গে খেলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছে তারা। লিয়োনেল মেসিদের নেতিবাচক ফুটবল প্রশ্ন তুলতে বাধ্য।
নব্বই মিনিটের বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষ হয়ে গিয়েছিল। আর্জেন্টিনা, গত বারের বিজয়ী, ২০১৯ থেকে বড় প্রতিযোগিতায় অপরাজিত থাকা দল তখনও গোলে একটিও শট নিতে পারেনি। সেই দলে কি না রয়েছেন লিয়োনেল মেসির মতো ফুটবলার।
৮৩ হাজার দর্শক। ৭০ শতাংশই আর্জেন্টিনার। তাদের সামনে স্পেন বার বার আক্রমণ করেও আর্জেন্টিনাকে গোল দিতে পারেনি। আর্জেন্টিনা দশ জন হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও স্পেনের আক্রমণ ভাগ বার বার ধাক্কা খাচ্ছিল আর্জেন্টিনার মজবুত রক্ষণে। একটা সময় মনেও হচ্ছিল এই ফাইনাল হয়তো ‘উন রোবো’, বা ডাকাতি হতে চলেছে।
সেই মুহূর্ত এল ১১৬ মিনিটে। নিকো উইলিয়ামসের হেড থেকে ফেরান তোরেসের শট। এবং গোল। এবং স্পেনের হাতে আবার বিশ্বকাপ। ওই একটি গোলেই টানা দু’বার বিশ্বকাপ হাতে তোলা হল না লিয়োনেল মেসির। রবিবার বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে ০-১ হেরে গেল আর্জেন্টিনা।
এ বারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে খারাপ ম্যাচ খেলল আর্জেন্টিনা। বস্তুত, তারা এতটাই খারাপ খেলেছে যে কী করে এই দল ফাইনালে উঠেছিল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। ১২০ মিনিটের ফুটবলে স্পেনের গোল লক্ষ্য করে একটিও শট নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা। মেসিকে গোটা মাঠে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাঁকে বল পাস করতেই পারেননি সতীর্থেরা। শেষের দিকে তেড়েফুঁড়ে বেশ কয়েক বার আক্রমণ করেছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু ১০ জনের দলের পক্ষে সম্ভব ছিল না ওই জায়গা থেকে ম্যাচে ফেরা। বরং একাধিক সুযোগ নষ্ট না করলে স্পেনের জয়ের ব্যবধান আরও বেশি হতে পারত।
বিশ্বকাপ তিনটি নকআউট ম্যাচে পিছিয়ে পড়ে জিতেছে আর্জেন্টিনা। যে দল ফাইনালে উঠেছে, তারা এত নেতিবাচক ফুটবল খেলবে কেন? সমর্থকেরা এই প্রশ্ন তুলতেই পারেন। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা স্রেফ রক্ষণই করে গেল। স্পেনকে আরও বেশি খেলার সুযোগ করে দিল। আর্জেন্টিনা নিজেদের রক্ষণের ফাঁসে এতটাই ফেঁসে গেল যে স্পেনের কাজ আরও সহজ হয়ে গেল।
ফাইনালের পরিসংখ্যান দেখলে আর্জেন্টিনার হতশ্রী দশা আরও স্পষ্ট হবে। স্পেনের ২০টি শটের বদলে আর্জেন্টিনা নিয়েছে মাত্র তিনটি শট। তিনটিই এসেছে শেষের তিন-চার মিনিটে। বল পজেশন স্পেনের ৬৮ শতাংশ, আর্জেন্টিনার ৩২ শতাংশয়। মোট পাস, নিখুঁত পাস, কর্নার— সব বিষয়েই আর্জেন্টিনার থেকে অনেক যোজন এগিয়ে ছিল স্পেন। তাই বিশ্বকাপ যে তারা যোগ্য দল হিসাবেই জিতেছে তা নিয়ে কোনও সন্দেহ থাকার কথাই নয়।
প্রথম একাদশে এ দিন তিনটি বদল এনেছিলেন আর্জেন্টিনার কোচ লিয়োনেল স্কালোনি। অভিজ্ঞ গঞ্জালো মন্তিয়েলকে নামিয়েছিলেন, যাতে প্রান্ত ধরে আক্রমণ করতে পারে আর্জেন্টিনা। রদ্রিগো দি পলকে নামানোর উদ্দেশ্য ছিল মাঝমাঠে বল নিয়ন্ত্রণ এবং বল বিতরণ করা আরও বাড়ানো। পাশাপাশি মেসিকে কিছুটা খোলা মনে খেলার সুবিধা করে দেওয়া। এ ছাড়াও ছিলেন লিয়ান্দ্রো পারেদেস। কিন্তু তিনটি বদলই কোনও কাজে লাগেনি। মন্তিয়েলকে প্রান্ত দিয়ে ওঠার জায়গা দেয়নি স্পেন। দি পলের পায়ে যত বার বল গিয়েছে, কোনও বারই বেশি ক্ষণ ধরে রাখতে পারেননি।
স্পেনের খেলার মধ্যে শুরু থেকেই একটা উদ্দেশ্য ছিল। যে ভাবে তারা খেলে এসেছে সে ভাবেই শুরু করেছিল। অর্থাৎ বল ধরে রাখা মাঝখান অথবা প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ করা। সেই সঙ্গে পাস খেলে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করে দেওয়া। এই কাজে মুখ্য ভূমিকা নেন রদ্রি। সঙ্গে বাঁ প্রান্তে সাহায্য করেন আলেক্স বায়েনা এবং মার্ক কুকুয়েরা। ডান প্রান্তে থাকেন লেমিনে ইয়ামাল। আর্জেন্টিনার উচিত ছিল কুকুরেয়া এবং ইয়ামালকে বল দেওয়ার রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া। সেই কাজ করতেই পারল না তারা। বল পেয়ে বার বার ইয়ামাল এবং কুকুরেয়া উঠে এলেন। চেষ্টা করলেন একের পর এক ক্রস এবং সেন্টার করার। আর্জেন্টিনার রক্ষণে লিসান্দ্রো মার্তিনেজ় এবং ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোকে ব্যস্ত থাকতে হল গোটা ম্যাচ।
একই সঙ্গে নজর কেড়েছে স্পেনের গতি। বল পেলেই দ্রুততার সঙ্গে আক্রমণে উঠছিল তারা। সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে বার বার সমস্যায় পড়েছে আর্জেন্টিনা। প্রথমার্ধে দাঁড়াতে পারেনি তারা। প্রথম ২০ মিনিটে মাত্র দু’বার বল পায়ে ঠেকিয়েছিলেন মেসি। গোটা প্রথমার্ধে তাঁর পায়ে বল এসেছে বার চারেক। ৩৯ বছর বয়সে স্বাভাবিক ভাবেই তিনি বেশি দৌড়তে পারবেন না। কিন্তু তাঁর পায়ে বল পৌঁছে দেওয়ার প্রাথমিক কাজটুকুও করতে পারেননি এনজ়ো ফের্নান্দেজ়, দি পলেরা।
আর্জেন্টিনার খেলায় কোনও পরিকল্পনাও চোখে পড়েনি। কৌশলের দিক থেকে গোটা ম্যাচেই পিছিয়ে থেকেছে তারা। স্পেনের ফুটবলারদের পিছনে দৌড়ে গিয়েছেন। বলের পিছনে তাড়া করেছেন। কিন্তু বল পাননি। সামনের দিকে কোনও পাসও খেলতে পারেননি। অন্যান্য ম্যাচে কোচ লিয়োনেল স্কালোনি এমন কিছু কৌশল নেন যা ম্যাচের রং বদলে দেয়। এ দিন হাতের সব তাস খেলে ফেললেও কাজে লাগেনি। উল্টে ফের্নান্দেজ়ের লাল কার্ড আর্জেন্টিনার সম্ভাবনা আরও শেষ করে দেয়।
ফের্নান্দেজ় প্রথম হলুদ কার্ড হজম করেন রাগ দেখানোর জন্য। রদ্রির কাছে বল হারানোর পর রেফারির কাছে ফাউলের আবেদন করেন। রেফারি পাত্তা না দেওয়ায় হাত ছুড়ে প্রতিবাদ করেন, যে কারণে হলুদ কার্ড দেখতে হয়। সংযুক্তি সময়ের খেলা চলার সময়ে ফের্নান্দেজ় এবং পাউ কুবারসির মাঝে বল এসেছিল। কুবারসিই সেই বলের নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়েছিলেন। ফের্নান্দেজ় দৌড়ে গিয়ে বলের নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়ে ফাউল করেন। রেফারি দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখাতে দ্বিধা করেননি। ওখানেই আর্জেন্টিনার জয়ের সম্ভাবনা অনেকাংশে শেষ হয়ে যায়।
স্পেন একের পর এক আক্রমণ করেছে। ক্রমাগত চাপ দিয়ে গিয়েছে আর্জেন্টিনা। তারা সুযোগ নষ্ট করেছে। কিন্তু হাল ছাড়েনি। এক বার ব্যর্থ হওয়ার পর ক্ষণে আবার ঝাঁপিয়ে পড়েছে আক্রমণে। শেষ পর্যন্ত আসল মুহূর্ত আসে ১০৬ মিনিটে। বেলজিয়াম এবং ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন পেদ্রো পোরো। এ দিন তাঁর লম্বা ক্রস একদম গোললাইনের কাছে পেয়েছিলেন নিকো উইলিয়ামস। তিনি হেড করে বল নামান তোরেসের উদ্দেশে। আর্জেন্টিনার ফুটবলারেরা বুঝতেই পারেননি ওখান থেকে তোরেসকে পাস দেওয়া হবে। ফলে তোরেস শট মারার মুহূর্তে আর্জেন্টিনার তিন জন ফুটবলার নিজেদের গোলের সামনে ছিলেন। তাঁদের এড়িয়ে তোরেসের বাঁ পায়ের শট আছড়ে পড়ে জালে।
লিয়োনেল মেসিকে নিয়ে কথা না বললে ফাইনালের ম্যাচ রিপোর্ট অধরাই থেকে যাবে। গোটা ম্যাচে প্রায় অদৃশ্য থাকার পর, নির্ধারিত সময়ের শেষের দিকে হঠাৎ যেন প্রাণ ফিরে পান মেসি। ফের্নান্দেজ়ের ফাউলের সময় রেফারির কাছে অভিযোগ করেন, কুকুরেয়া হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কথা বলেছেন। তাতে কোনও লাভ হয়নি।
কেরিয়ারে বিশ্বকাপে প্রচুর ভাল ম্যাচ খেলেছেন মেসি। এ বারের বিশ্বকাপে তার কিছু দেখা গিয়েছে। কিন্তু রবিবারের পারফরম্যান্স তার লক্ষ লক্ষ মাইলের মধ্যেও আসবে না। এই ম্যাচে তিনি কোনও প্রভাবই ফেলতে পারেননি। দলকে কোনও ভাবে সাহায্য করতে পারেননি। দলের বিপদের সময়ের একার হাতে উদ্ধার করতে পারেননি। বহু ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে উতরে দিয়েছেন। কিন্তু এই বয়সে তাঁকে অবিশ্বাস্য কিছু করতে হলে পায়ে বল তো পেতে হবে। সেটাই তো সতীর্থেরা দিতে পারলেন না।
মেসির বিশ্বকাপ অধ্যায় শেষ হল খুবই খারাপ ভাবে। হয়তো গত বারের সুখের স্মৃতি নিয়ে বিদায় নিতে পারতেন তিনি। কিন্তু নিজেকে আরও এক বার চ্যালেঞ্জ জানাবেন বলেই আমেরিকায় বিশ্বকাপ খেলতে রাজি হয়েছিলেন। দিনের শেষে তার জন্য পস্তাবেন কি না, তা অবশ্য অজানাই থাকবে।

